বাংলাদেশের তরুণদের প্রধান সমস্যা: চাকরির বাজার, দক্ষতা সংকট, শিক্ষিত বেকারত্ব এবং কারিগরি শিক্ষার কাঠামোগত বিশ্লেষণ
ভূমিকা
বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি গত দেড় দশকে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও, এই প্রবৃদ্ধির একটি অন্তর্নিহিত দুর্বলতা হলো এর কর্মসংস্থানহীন চরিত্র। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশের যে সুবর্ণ সময়ের মধ্য দিয়ে দেশটি অতিক্রম করছে, তা একটি কাঠামোগত কর্মসংস্থান সংকটের কারণে প্রবল ঝুঁকির সম্মুখীন। একদিকে লাখ লাখ তরুণ প্রতি বছর শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে, অন্যদিকে আনুষ্ঠানিক ও উচ্চ-উৎপাদনশীল খাতের সংকুচিত সুযোগ তাদের বেকারত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS), আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF), বিশ্বব্যাংক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) এবং বিভিন্ন স্বনামধন্য গবেষণা সংস্থার তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে প্রণীত এই গভীর বিশ্লেষণী প্রবন্ধে বাংলাদেশের তরুণ সমাজের প্রধান সমস্যাগুলোকে বহুমাত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা হয়েছে। এই প্রবন্ধে উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বের ভয়াবহতা, ডিগ্রি স্ফীতি, দক্ষতা ও যোগ্যতার অসামঞ্জস্যতা, নিট (NEET) বা সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় তরুণ গোষ্ঠীর সংকট, বিসিএস বা সরকারি চাকরির প্রতি সামাজিক মোহ এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার (TVET) সম্ভাবনা ও প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। একইসঙ্গে, বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত পরিবর্তন বা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে শ্রমবাজারের ভবিষ্যৎ চাহিদা এবং কাঠামোগত সংস্কারের দিকনির্দেশনাও এই গবেষণায় সুবিন্যস্ত করা হয়েছে।
সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং শ্রমবাজারের বর্তমান চিত্র
বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ বর্তমানে কর্মক্ষম। দেশের মোট জনসংখ্যার গড় বয়স ২৬ থেকে ২৭ বছর, যা জনমিতিক লভ্যাংশের একটি আদর্শ সময় নির্দেশ করে। প্রতি বছর দেশে প্রায় ২০ লাখ নতুন তরুণ-তরুণী শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। কিন্তু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও এই বিশাল শ্রমশক্তির জন্য পর্যাপ্ত উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) লেবার ফোর্স সার্ভে (LFS) ২০২৪-এর চূড়ান্ত তথ্যমতে, দেশে মোট বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৬ লাখ ২৪ হাজার। এই বিশাল বেকার গোষ্ঠীর মধ্যে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের সংখ্যাই প্রায় ২০ লাখ ৩২ হাজার, যা মোট বেকারের একটি বিশাল অংশ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৫-২৯ বছর বয়সী তরুণ শ্রমশক্তির মধ্যে বেকারত্বের হার ৭.২ শতাংশ। সামগ্রিকভাবে দেশের মোট বেকার জনসংখ্যার ৭৮.৯ শতাংশই হলো তরুণ।
শ্রমবাজারের এই পরিসংখ্যানগুলোর গভীরে আরও কিছু ভৌগোলিক ও লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য লুকিয়ে আছে। উদাহরণস্বরূপ, মোট বেকার তরুণের ৮০.৭ শতাংশই গ্রামাঞ্চলে বসবাস করে, যেখানে শহরাঞ্চলে এই হার ৭৫.১ শতাংশ। আপাতদৃষ্টিতে বাংলাদেশের জাতীয় বেকারত্বের হার ৪.৪ শতাংশ বা তার আশেপাশে দেখানো হলেও, এই পরিসংখ্যানটি মূলত অনানুষ্ঠানিক খাতের (Informal Sector) নিম্ন আয়ের এবং অস্থিতিশীল কাজের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে কম দেখায়। প্রকৃতপক্ষে, বাংলাদেশের শ্রমবাজারে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের জন্য মানসম্মত এবং আনুষ্ঠানিক (Formal) কর্মসংস্থানের তীব্র অভাব রয়েছে। অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত শ্রমিকদের চাকুরির নিরাপত্তা, ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ বা কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি থাকে না, যা প্রচলিত বেকারত্বের পরিসংখ্যানে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয় না।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মডেলটি মূলত তৈরি পোশাক শিল্প (RMG) এবং রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল, যা স্বল্প-মজুরি এবং স্বল্প-দক্ষতা নির্ভর। শিল্প খাত জিডিপির ৩৭.৪৪ শতাংশ অবদান রাখলেও এটি মোট কর্মসংস্থানের মাত্র ১৭.৩৮ শতাংশ ধারণ করে। অন্যদিকে সেবা খাত জিডিপির ৫১.৬২ শতাংশ অবদান রাখলেও এটি কর্মসংস্থানের ৩৮ শতাংশেরও কম ধারণ করে। এই পরিসংখ্যানগুলো প্রমাণ করে যে, দেশে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেটি কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছে না (Jobless Growth)। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, শিল্প খাতে বার্ষিক ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হওয়া সত্ত্বেও গত এক দশকে প্রায় ১৪ লাখ কর্মসংস্থান হারিয়ে গেছে।
উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বের কাঠামোগত সংকট এবং স্ববিরোধিতা
বাংলাদেশের শ্রমবাজারের সবচেয়ে বড় প্যারাডক্স বা স্ববিরোধিতা হলো—শিক্ষাগত যোগ্যতা যত বৃদ্ধি পায়, বেকারত্বের হারও তত বৃদ্ধি পায়। এই পরিস্থিতিকে অর্থনীতিবিদরা 'শিক্ষিত বেকারত্বের সংকট' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবিহীন বা নিরক্ষর জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেকারত্বের হার মাত্র ১.২৫ শতাংশ। এর প্রধান কারণ হলো, নিরক্ষর বা স্বল্পশিক্ষিত ব্যক্তিরা বেঁচে থাকার তাগিদে অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে যেকোনো নিম্ন আয়ের বা কায়িক শ্রমের কাজ গ্রহণ করতে বাধ্য হন। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় থেকে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী (Tertiary Education) তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৩.৫ শতাংশ থেকে ১৩.৫৪ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে, যা ২০১০ সালের ৪.৯ শতাংশ থেকে প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বের এই ভয়াবহতা সম্পর্কে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) একটি প্রতিবেদনে আরও আশঙ্কাজনক চিত্র উঠে এসেছে। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষিত তরুণদের প্রায় ২৯ শতাংশ থেকে ৩৬ শতাংশই বেকার। প্রতি তিনজনে একজন উচ্চশিক্ষিত তরুণ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বেকার থাকছেন। পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, উচ্চশিক্ষিত তরুণ চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে ১৭ শতাংশের বেশি দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে বেকার এবং ১৫ শতাংশের বেশি এক থেকে দুই বছর ধরে বেকার রয়েছেন।
| শিক্ষাগত যোগ্যতা বা স্তর | বেকারত্বের হার (%) | বেকারত্বের প্রকৃতি ও কাঠামোগত প্রবণতা |
| কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই | ১.২৫% | মূলত অনানুষ্ঠানিক খাত, কায়িক শ্রম ও কৃষিতে নিয়োজিত। বেকারত্ব প্রায় শূন্য। |
| মাধ্যমিক / উচ্চ মাধ্যমিক | মাঝারি পর্যায় | দ্রুত কাজে প্রবেশের সুযোগ থাকে, তবে আয়ের স্তর নিম্ন এবং কাজের নিশ্চয়তা কম। |
| স্নাতক বা স্নাতকোত্তর (Tertiary) | ১৩.৫% - ১৩.৫৪% | উচ্চ প্রত্যাশা এবং আনুষ্ঠানিক খাতের কাজের অভাবে দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্ব। |
| উচ্চশিক্ষিত (IMF-এর প্রতিবেদন) | ২৯% - ৩৬% | প্রতি তিনজনে একজন বেকার; দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্বের শিকার। অর্ধেকের বেশি যোগ্যতার নিচে কাজ করেন। |
সারণি ১: শিক্ষাগত যোগ্যতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের বেকারত্বের তুলনামূলক চিত্র
উচ্চশিক্ষিত কর্মীদের প্রায় অর্ধেকই এমন সব চাকরিতে নিয়োজিত আছেন, যা তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার চেয়ে অনেক নিচের স্তরের। অর্থনীতিতে একে বলা হয় 'কোয়ালিফিকেশন মিসম্যাচ' বা যোগ্যতার অসামঞ্জস্যতা। যখন কোনো কাঠামোগত চাহিদা থাকে না, তখন উচ্চ ডিগ্রিধারীরা বাধ্য হয়ে এমন কাজ বেছে নেন যেখানে ডিগ্রির আদৌ কোনো প্রয়োজন নেই।
বর্তমানে দেশে প্রায় ৯ লাখ ৬ হাজার (৯,০৬,০০০) স্নাতক ডিগ্রিধারী বেকার রয়েছেন, যা আট বছর আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে প্রায় ৭ লাখ স্নাতক শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন, কিন্তু দেশের অর্থনীতি স্বাভাবিক ব্যবসায়িক পরিবেশে সর্বোচ্চ ৩ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম। এর অর্থ হলো, অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি স্নাতক প্রতি বছর তৈরি হচ্ছে। নিয়োগকর্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন নিয়োগ প্রায় বন্ধ, কেবল যারা চাকরি ছাড়ছেন বা মারা যাচ্ছেন, তাদের শূন্যস্থানগুলো পূরণ করা হচ্ছে।
ডিগ্রি স্ফীতি, মানহীন শিক্ষা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোগত ত্রুটি
উচ্চশিক্ষার এই ব্যাপক প্রসারের পেছনে রয়েছে অপরিকল্পিত শিক্ষানীতি এবং ব্যাঙের ছাতার মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিস্তার। বর্তমানে বাংলাদেশে ১৬৩টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যার মধ্যে ৫৩টি সরকারি এবং ১১০টি বেসরকারি। ২০১০ সালের পর থেকে ২২টি সরকারি এবং ৫৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু শিক্ষার গুণগত মান বজায় রাখার ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠানগুলো চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (UGC) তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৩৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত ২০:১ এর বেশি এবং ৫১টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫ জনেরও কম অধ্যাপক রয়েছেন। মোট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বর্তমানে প্রায় ৪৮ লাখ ২০ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। এই বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থীর মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য পর্যাপ্ত অবকাঠামো, গবেষণাগার বা যোগ্য শিক্ষক নেই। ফলে ডিগ্রির মান কমে যাচ্ছে, যাকে 'ডিগ্রি স্ফীতি' বা Degree Inflation বলা হয়। ডিগ্রি স্ফীতির কারণে নিয়োগকর্তারা এখন শুধুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রির ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না, তারা দক্ষতা-ভিত্তিক নিয়োগের (Skills-based hiring) দিকে ঝুঁকছেন।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। দেশে প্রতি বছর যে ৭ লাখ স্নাতক তৈরি হয়, তার ৬২ শতাংশই আসে একটি মাত্র প্রতিষ্ঠান—জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (BIDS) এবং জব পোর্টাল বিডিজবস-এর জরিপে দেখা গেছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ২৮ শতাংশ থেকে ৩৫ শতাংশ স্নাতক বেকার থেকে যান, এমনকি ৩০ বছর বয়স পার হওয়ার পরও যখন সরকারি-বেসরকারি চাকরির দরজা বন্ধ হয়ে যায়।
এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো বিষয়ভিত্তিক অসামঞ্জস্যতা। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৬৩ শতাংশ শিক্ষার্থী কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান (Humanities and Social Sciences) নিয়ে পড়াশোনা করেন, যে ক্ষেত্রগুলোতে আধুনিক চাকরির বাজারে চাহিদা অত্যন্ত সীমিত। এর বিপরীতে, নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে বেকারত্বের হার প্রায় শূন্যের কোঠায়। যেমন—ইংরেজি স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্ব মাত্র ০.১৭ শতাংশ, অর্থনীতি ও হিসাববিজ্ঞানে ০.৩৫ শতাংশ, সমাজবিজ্ঞানে ০.৬৯ শতাংশ এবং অর্থায়ন ও ব্যাংকিংয়ে ০.৭২ শতাংশ। এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, উচ্চশিক্ষার প্রসার ঘটলেও তা শ্রমবাজারের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
দক্ষতা বনাম কাঠামোগত চাহিদার অভাব: একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
বাংলাদেশের নীতিনির্ধারক মহলে গত দুই দশক ধরে একটি ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত আছে যে, তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের মূল কারণ হলো 'দক্ষতার অভাব' বা Skills Shortage। এই প্রচলিত আখ্যান অনুযায়ী, শিক্ষাক্রমের দুর্বলতা বা তরুণদের মানিয়ে নেওয়ার অক্ষমতার কারণেই বেকারত্ব তৈরি হচ্ছে, এবং রাষ্ট্র যদি শুধু আরও প্রশিক্ষণ বা সফট-স্কিলস ওয়ার্কশপের ব্যবস্থা করে, তবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পূর্ণ কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
কিন্তু সামষ্টিক অর্থনীতির মৌলিক তত্ত্ব অনুযায়ী, বাজারে যদি কার্যকর চাহিদা (Effective Demand) না থাকে, তবে একটি দেশে যতই উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন জনবল থাকুক না কেন, তা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবে না। বাংলাদেশে স্নাতক পর্যায়ে ব্যাপক প্রসার ঘটেছে, কিন্তু সেই স্নাতকদের ধারণ করার মতো আধুনিক ও উচ্চ-উৎপাদনশীল করপোরেট প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়নি। অদক্ষ বা স্বল্পশিক্ষিত শ্রমিকরা সহজেই নিম্ন মজুরিতে অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ পেয়ে যান, কিন্তু উচ্চশিক্ষিত স্নাতকরা যখন আধুনিক ও উচ্চ-উৎপাদনশীল কাজ খোঁজেন, তখন তারা কাঠামোগত চাহিদার তীব্র অভাবে পড়েন। এটি প্রমাণ করে যে, বর্তমান বেকারত্বের মূল কারণ নিছক দক্ষতার অভাব নয়, বরং কাঠামোগত অর্থনৈতিক চাহিদার তীব্র সংকট।
তারপরও, যেটুকু কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে, সেখানেও দক্ষতার অসামঞ্জস্যতা (Skills Mismatch) একটি বড় বাধা। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ৮২.৫ শতাংশ উত্তরদাতা কর্মক্ষেত্রে দক্ষতাগত অসামঞ্জস্যতার শিকার হয়েছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তাত্ত্বিক শিক্ষায় বেশি জোর দিচ্ছে, কিন্তু শিল্প খাতের (Industry) চাহিদানুযায়ী ব্যবহারিক জ্ঞান, সফট স্কিলস এবং ডিজিটাল দক্ষতা শেখাতে ব্যর্থ হচ্ছে।
দক্ষতার অসামঞ্জস্যতা সাধারণত তিনটি ভিন্ন রূপে দেখা যায়:
- কোয়ালিফিকেশন মিসম্যাচ (Qualification Mismatch): একজন কর্মী এমন একটি কাজ করছেন, যার জন্য তার অর্জিত ডিগ্রির কোনো প্রয়োজন নেই।
- ফিল্ড-অফ-স্টাডি মিসম্যাচ (Field-of-Study Mismatch): একজন শিক্ষার্থী নির্দিষ্ট একটি বিষয়ে স্নাতক করে সম্পূর্ণ ভিন্ন পেশায় কাজ করছেন, যেখানে তার পঠিত বিষয়ের কোনো প্রয়োগ নেই।
- প্রকৃত দক্ষতার ঘাটতি (Skills Gap): একজন শিক্ষার্থী নির্দিষ্ট বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করলেও সেই বিষয়ের ব্যবহারিক বা প্রয়োগিক জ্ঞান তার নেই।
দেশি বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের (FDI) অভাব এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (CPD) মতে, দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রধান চালিকাশক্তি হলো দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ, যা বর্তমানে স্থবির হয়ে আছে।
কর্মহীন, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণবিহীন তরুণ গোষ্ঠী (NEET): একটি গভীরতর সামাজিক সংকট
বেকারত্বের প্রচলিত পরিসংখ্যানের বাইরে আরেকটি ভয়াবহ সূচক হলো NEET (Not in Education, Employment, or Training)। অর্থাৎ, তরুণদের একটি বিশাল অংশ পড়াশোনা করছে না, কোনো চাকরিতে নিয়োজিত নেই, এমনকি কোনো ধরনের দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণেও যুক্ত নেই।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে সার্বিকভাবে ১৮.৯ শতাংশ NEET ক্যাটাগরিতে পড়ে, যার মধ্যে পুরুষদের হার ১৫.৪ শতাংশ এবং নারীদের হার ২২.১ শতাংশ। তবে ১৫-১৯ বছর বয়সীদের মধ্যে এই হার সবচেয়ে বেশি, যা প্রায় ৪০.৭ শতাংশ বা ৩৩ লাখ ৬০ হাজার। ২৫-২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে এই হার ৩০ শতাংশ এবং ২০-২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ২৯.৩ শতাংশ। ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায়, মোট নিট (NEET) তরুণদের ৪১.৯ শতাংশ গ্রামাঞ্চলে এবং ৫৮.১ শতাংশ শহরাঞ্চলে বসবাস করে।
তবে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) পরিমাপ পদ্ধতি এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD)-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের তরুণদের একটি বিশাল অংশ (প্রায় ৪১ শতাংশ বা ১ কোটি ২৯ লাখ) অর্থনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় বা Inactive। তারা শ্রমশক্তির অংশ নয় এবং তারা সক্রিয়ভাবে কাজও খুঁজছেন না। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এটি সমাজের একটি চরম ব্যর্থতা, কারণ তরুণেরা কাজের বাজার থেকে ছিটকে গিয়ে পুরোপুরি হাল ছেড়ে দিচ্ছেন।
| নিট (NEET) সূচক | পরিসংখ্যান বা হার | মন্তব্য |
| ১৫-২৯ বছর বয়সীদের সামগ্রিক হার | ১৮.৯% (BBS) | সার্বিক বেকারত্বের হারের চেয়ে অনেক বেশি। |
| নিট জনগোষ্ঠীর মধ্যে লিঙ্গভিত্তিক বিভাজন | নারী ৬১.৭%, পুরুষ ৩৮.৩% | নারীদের মধ্যে নিষ্ক্রিয়তার হার ভয়াবহ। |
| তরুণীদের (১৫-২৪ বছর) মধ্যে নিট হার | ৬২% | প্রতি পাঁচজন তরুণীর মধ্যে তিনজনই কর্ম ও শিক্ষার বাইরে। |
| মোট নিষ্ক্রিয় তরুণ (CPD বিশ্লেষণ) | ৪১% (প্রায় ১.২৯ কোটি) | এরা কাজ খুঁজছেন না এবং অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন না। |
সারণি ২: বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে NEET বা নিষ্ক্রিয়তার পরিসংখ্যান
নারী নিট-এর পরিস্থিতি সবচেয়ে শোচনীয়। বিসিএস স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস ২০২২ এবং অন্যান্য গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশের ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণীদের প্রায় ৬২ শতাংশই NEET ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে মোট নিট জনসংখ্যার ৬১.৭ শতাংশই নারী। এর পেছনে বেশ কয়েকটি কাঠামোগত ও সামাজিক কারণ দায়ী। প্রথমত, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের বাল্যবিবাহের হার সর্বোচ্চ। বিয়ের পর মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং গৃহস্থালির কাজে আবদ্ধ হয়ে পড়ার কারণে তারা শ্রমশক্তি থেকে ছিটকে পড়ে। দ্বিতীয়ত, আনুষ্ঠানিক খাতে কাজ করার জন্য নিরাপদ যাতায়াত ও কর্মপরিবেশের অভাব রয়েছে। তৃতীয়ত, একসময় পোশাক শিল্প গ্রামীণ নারীদের কর্মসংস্থানের একটি বড় মাধ্যম থাকলেও, অটোমেশনের কারণে এই খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার কমে গেছে।
এই বিশাল নিষ্ক্রিয় জনগোষ্ঠী দেশের অর্থনীতির জন্য একটি 'টিকিং টাইম বম্ব' বা সময়বোমা হিসেবে কাজ করছে। যদি এত বড় একটি অংশ অর্থনীতিতে কোনো অবদান না রাখে, তবে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অর্জন করা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।
বিসিএস এবং সরকারি চাকরির প্রতি সামাজিক মোহ
বাংলাদেশের শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে সরকারি চাকরি, বিশেষ করে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (BCS) ক্যাডার হওয়ার এক তীব্র মোহ তৈরি হয়েছে, যা 'বিসিএস কালচার' নামে পরিচিত।
এর পেছনে অত্যন্ত যৌক্তিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণ রয়েছে। বেসরকারি খাতে চাকরির অনিশ্চয়তা, নিম্ন বেতন কাঠামো, কর্মঘণ্টার কোনো নির্দিষ্ট সীমা না থাকা, শ্রম আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং সামাজিক মর্যাদার অভাব তরুণদের বেসরকারি খাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করছে। ফলে, একজন স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পাস করা তরুণ বেসরকারি খাতের কাজ বা উদ্যোক্তা হওয়ার ঝুঁকি না নিয়ে, দিনের পর দিন শুধু বিসিএস বা অন্যান্য সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
বিসিএস-এর এই দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া তরুণদের জীবনের সবচেয়ে উৎপাদনশীল সময়গুলো (২০ থেকে ৩০ বছর বয়স) কেড়ে নিচ্ছে। তারা মেস বা হোস্টেলে থেকে সামান্য টিউশনি করে বা পরিবারের কাছ থেকে টাকা নিয়ে জীবনযাপন করছেন এবং বারবার পরীক্ষায় অবতীর্ণ হচ্ছেন। লাখ লাখ তরুণ একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক পদের জন্য প্রতিযোগিতা করায়, সিংহভাগই ব্যর্থ হচ্ছেন। এই দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্ব তাদের মধ্যে হতাশা, মানসিক চাপ এবং আত্মবিশ্বাসের অভাব তৈরি করছে। এটি দেশের মানবসম্পদের একটি বিশাল অপচয়, কারণ এই তরুণরা যদি ছোট কোনো উদ্যোগ নিতেন বা বেসরকারি খাতে কাজ শুরু করতেন, তবে সামষ্টিক অর্থনীতির চাকা আরও দ্রুত সচল হতো।
কারিগরি শিক্ষা ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণ (TVET): সম্ভাবনা, সামাজিক বাধা এবং বাস্তবতা
উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বের এই ভয়াবহ চিত্র থেকে উত্তরণের একটি বৈশ্বিক প্রমাণিত পথ হলো কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ বা Technical and Vocational Education and Training (TVET)। জার্মানি, সুইজারল্যান্ড বা অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশগুলোতে মাধ্যমিক স্তরের পর প্রায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী কারিগরি শিক্ষায় যুক্ত হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এই চিত্রটি হতাশাজনক।
বাংলাদেশ সরকারের 'জাতীয় দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলপত্র-২' (NSAPR II) অনুযায়ী, ২০২০ সালের মধ্যে কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির হার ২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তব চিত্র এখনও অনেক পিছিয়ে। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BANBEIS) এবং অন্যান্য গবেষণা অনুযায়ী, কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির হার বর্তমানে ১৩.৮৪ শতাংশ থেকে ১৬ শতাংশের মধ্যে আটকে আছে। ইউনেস্কোর (UNESCO) ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বৃত্তিমূলক প্রোগ্রামে মোট ভর্তির হার ১২.৫ শতাংশ, যেখানে নারীদের ভর্তির হার মাত্র ৩.৬ শতাংশ থেকে ৭.৩ শতাংশের মধ্যে সীমিত।
বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের (BTEB) অধীনে সারা দেশে ৩,৬৪৯টি টিভিইটি (TVET) প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার মধ্যে মাত্র ৪৫৫টি (১২.৫%) সরকারি প্রতিষ্ঠান। আরও আশঙ্কাজনক তথ্য হলো, বাংলাদেশ লেবার ফোর্স সার্ভের তথ্যমতে দেশের মোট কর্মশক্তির মাত্র ২ শতাংশের পেশাদারি বা বৃত্তিমূলক যোগ্যতা (Professional Qualifications) রয়েছে। মাধ্যমিক স্তরে সাধারণ শিক্ষায় ঝরে পড়ার হার ৩৭.৩৯ শতাংশ হওয়া সত্ত্বেও, সেই শিক্ষার্থীরা কারিগরি শিক্ষায় যুক্ত হচ্ছে না।
চাকরির বাজারে দক্ষ জনবলের প্রচুর চাহিদা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের মানুষ কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে সাধারণ শিক্ষার (মেইনস্ট্রিম এডুকেশন) চেয়ে 'নিকৃষ্ট' বা 'নিম্নমানের' বলে মনে করে। ব্র্যাকের (BRAC) একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যে তরুণরা কারিগরি শিক্ষায় আগ্রহী, তাদের পরিবার এবং সমাজ থেকে প্রবল বাধার সম্মুখীন হতে হয়। সমাজে সাধারণ ডিগ্রিধারী (যেমন—বিএ, এমএ) ব্যক্তিদের বেশি সম্মান দেওয়া হয়, অন্যদিকে কারিগরি কাজকে কায়িক শ্রম বা 'গরিবের শিক্ষা' হিসেবে দেখা হয়।
সামাজিক কলঙ্ক (Social Stigma) ছাড়াও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা কারিগরি শিক্ষার প্রসারে বড় বাধা। বেশিরভাগ পলিটেকনিক বা ভোকেশনাল ইন্সটিটিউটে মানসম্মত ল্যাব, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং দক্ষ প্রশিক্ষক নেই। পাঠ্যক্রম দশকের পর দশক পুরনো, যা আধুনিক শিল্পের চাহিদার সাথে মানানসই নয়। তাছাড়া, কারিগরি শিক্ষা গ্রহণ করার পর উচ্চশিক্ষার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত, যার ফলে একটি ক্যারিয়ার পাথওয়ে বা ভবিষ্যৎ রূপরেখার অভাবে মেধাবী শিক্ষার্থীরা এই মাধ্যমে আসতে চান না।
দক্ষতা উন্নয়নে সফল এনজিও মডেল এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা
সরকারি খাতের দুর্বলতার বিপরীতে বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা (NGO) এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্প দক্ষতা উন্নয়নে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে।
ইউসেপ বাংলাদেশ (UCEP Bangladesh): ইউসেপ মূলত সুবিধাবঞ্চিত এবং ঝরে পড়া শিশু-কিশোরদের কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদান করে। ইউসেপ-এর কারিগরি স্কুলগুলো থেকে পাস করা স্নাতকদের প্রায় ৯০ শতাংশই গ্র্যাজুয়েশনের ৬ মাসের মধ্যে মানসম্মত কর্মসংস্থানে (Decent Work) যুক্ত হতে সক্ষম হয়। তারা শুধু প্রশিক্ষণই দেয় না, বরং 'জব প্লেসমেন্ট সেল'-এর মাধ্যমে সরাসরি শিল্পের সাথে শিক্ষার্থীদের যুক্ত করে দেয়। ২০২২ সালে ইউসেপ-এর এসএসসি ভোকেশনাল পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৯৮ শতাংশ (যেখানে জাতীয় গড় ৮৯%), এবং পলিটেকনিকে পাসের হার ছিল ৮৪ শতাংশ। এটি প্রমাণ করে যে, সঠিক দিকনির্দেশনা থাকলে কারিগরি শিক্ষায় অসাধারণ ফল লাভ সম্ভব।
ব্র্যাক (BRAC): ব্র্যাকের 'ইনস্টিটিউট অব স্কিলস ডেভেলপমেন্ট' ৮টি জেলায় ১০টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র পরিচালনা করছে। ব্র্যাকের 'STAR' (Skills Training for Advancing Resources) মডেলটি মূলত শিক্ষানবিস বা অ্যাপ্রেন্টিসশিপ-ভিত্তিক (Apprenticeship) প্রশিক্ষণ দেয়, যা শিশুশ্রম রোধে এবং যুব কর্মসংস্থানে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখছে। এই প্রোগ্রামের মাধ্যমে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তরুণদের পারিবারিক আয় গড়ে ৭৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্র্যাক বিশেষ করে নারীদের অপ্রচলিত পেশায় (যেমন—আইটি টেকনিশিয়ান, মেকানিক) যুক্ত করতে ব্যাপক কাজ করছে, যা নারী ক্ষমতায়নে একটি মডেল।
বিশ্বব্যাংকের সহায়তা: কারিগরি ও দক্ষতা উন্নয়নের জন্য বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ সরকারকে বিপুল অর্থায়ন করছে। ৯ লাখ গ্রামীণ তরুণকে কর্মমুখী প্রশিক্ষণ ও উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ করে দিতে বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি ৩০ কোটি ডলারের (৩০০ মিলিয়ন) একটি অর্থায়ন চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এছাড়া 'RAISE' (Recovery and Advancement of Informal Sector Employment) প্রকল্পের মাধ্যমে অনানুষ্ঠানিক খাতের তরুণদের অর্থনৈতিক সুযোগ বৃদ্ধি করতেও বিশ্বব্যাংক সহায়তা প্রদান করছে।
ভবিষ্যতের চাকরির বাজার, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব এবং উদীয়মান দক্ষতা
চতুর্থ শিল্প বিপ্লব (4th Industrial Revolution) এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) ব্যাপক প্রসারের কারণে বৈশ্বিক চাকরির বাজার অভাবনীয় দ্রুততায় পরিবর্তিত হচ্ছে। আইএমএফ (IMF) এবং আইএলও (ILO) সতর্ক করেছে যে, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে কর্মীদের দক্ষতা না বাড়ালে বাংলাদেশের কর্মসংস্থান সংকট আরও গভীর হবে।
অটোমেশন বা যন্ত্রায়নের কারণে বিশ্বব্যাপী প্রায় ১৪ শতাংশ কর্মীকে অদূর ভবিষ্যতে তাদের পেশা পরিবর্তন করতে হতে পারে। বাংলাদেশের তরুণরা এই প্রযুক্তিগত রূপান্তরের মুখোমুখি হওয়ার জন্য মোটেও প্রস্তুত নয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থান একটি 'টিকিং টাইম বম্ব' এর মতো, যা বাংলাদেশের হোয়াইট-কলার বা অফিসিয়াল চাকরির বাজারকে মারাত্মকভাবে সংকুচিত করবে। এর মূল কারণ হলো, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (STEM) শিক্ষায় এখনও অনেক পিছিয়ে।
তবে ডিজিটাল রূপান্তরের এই যুগে নতুন নতুন সুযোগও তৈরি হচ্ছে। ২০২৫ সাল এবং তার পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের চাকরির বাজারে আইটি (IT) এবং প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতার চাহিদা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাবে।
| উদীয়মান দক্ষতার ক্ষেত্র | প্রয়োজনীয়তা এবং প্রয়োগ |
| কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং (AI/ML) | স্বাস্থ্যসেবা, অর্থায়ন, ই-কমার্স এবং অটোমেশনে এগুলোর ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়েছে। পাইথন (Python), টেনসরফ্লো (TensorFlow) শেখা জরুরি। |
| সাইবার সিকিউরিটি (Cybersecurity) | ব্যাংক এবং ফিনটেক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সিস্টেম সুরক্ষিত রাখতে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের চাহিদা বাড়ছে। |
| ক্লাউড কম্পিউটিং (Cloud Computing) | AWS, Google Cloud, Azure-এর মাধ্যমে ভার্চুয়াল সার্ভার ও ডেটা ম্যানেজমেন্ট। |
| ডেটা সায়েন্স এবং বিগ ডেটা | কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোতে ডেটা-চালিত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য SQL, R, Power BI জানা ডেটা অ্যানালিস্টদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। |
| ইউআই/ইউএক্স ডিজাইন (UI/UX) | ওয়েবসাইট এবং অ্যাপ্লিকেশনের ব্যবহারকারী অভিজ্ঞতা উন্নত করার জন্য এটি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। |
সারণি ৩: ২০২৫ ও তৎপরবর্তী সময়ের জন্য অত্যাবশ্যকীয় আইটি দক্ষতা
এই ধরনের দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রথাগত বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির চেয়ে কারিগরি সক্ষমতা এবং ধ্রুবক শিখন (Lifelong learning) বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
নীতিনির্ধারণী সুপারিশমালা এবং কাঠামোগত সংস্কার
বেকারত্ব, দক্ষতা সংকট এবং কারিগরি শিক্ষার পশ্চাৎপদতা দূর করতে কোনো একক পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। এজন্য প্রয়োজন সরকারি, বেসরকারি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার। বিশ্বব্যাংক, আইএলও এবং ইউনেস্কো উন্নয়নশীল দেশগুলোর কারিগরি শিক্ষা ও কর্মসংস্থান নিয়ে যে রূপরেখা দিয়েছে, তার আলোকে বাংলাদেশের জন্য নিম্নোক্ত সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি:
১. সামষ্টিক অর্থনীতির বহুমুখীকরণ এবং আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি: শুধু দক্ষতা বাড়ালেই কাজ হবে না, কাঠামোগত কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করতে হবে। তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর একক নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে ফার্মাসিউটিক্যালস, চামড়া শিল্প, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, আইটি এবং কৃষিজাত শিল্পে (Agro-processing) দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হবে। সরকার এবং বেসরকারি খাতকে এমন শিল্প নীতি প্রণয়ন করতে হবে, যা বেশি কর্মসংস্থান তৈরি করে (Labor-intensive)। স্টার্টআপ (Startup) এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ ও মেন্টরিং সুবিধা দিতে হবে, যাতে তারা চাকরি খোঁজার বদলে চাকরিদাতা হতে পারে। নমনীয় কর্মসংস্থান নীতি (Flexible employment protection) তৈরি করতে হবে, যাতে আনুষ্ঠানিক খাতের বিস্তার ঘটে।
২. শিক্ষাব্যবস্থা ও শিল্পের মাঝে সেতুবন্ধন (Industry-Academia Linkage): বিশ্ববিদ্যালয় এবং কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবশ্যই শিল্পের (Industry) সাথে যুক্ত হতে হবে। শিক্ষাক্রম (Curriculum) প্রণয়নের সময় নিয়োগদাতাদের মতামত নিতে হবে। তাত্ত্বিক শিক্ষার পাশাপাশি ইন্টার্নশিপ এবং অ্যাপ্রেন্টিসশিপ (Apprenticeship) বাধ্যতামূলক করতে হবে। ডুয়াল ভোকেশনাল ট্রেনিং (Dual Vocational Training) চালু করা যেতে পারে, যেখানে একজন শিক্ষার্থী সপ্তাহে কয়েকদিন ক্লাসে শিখবেন এবং বাকি সময় কারখানায় বা কর্মক্ষেত্রে হাতে-কলমে কাজ করবেন।
৩. উচ্চশিক্ষার লাগাম টানা এবং মান নিয়ন্ত্রণ: যত্রতত্র মানহীন বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিষয়ভিত্তিক আসন সংখ্যা বৃদ্ধির লাগাম টেনে ধরতে হবে। বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলকে (BAC) আরও শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে মানহীন প্রোগ্রামগুলো বাতিল করা যায়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাক্রমে আমূল পরিবর্তন এনে কারিগরি ও ভাষা শিক্ষাকে (Language Education) যুক্ত করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা স্নাতক শেষ করে দ্রুত কাজ পেতে পারে।
৪. কারিগরি শিক্ষার আধুনিকায়ন এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন: কারিগরি শিক্ষাকে 'ড্রপআউট' বা দুর্বল শিক্ষার্থীদের জায়গা হিসেবে দেখার সামাজিক কলঙ্ক দূর করতে হবে। এজন্য কারিগরি শিক্ষায় 'ন্যাশনাল স্কিলস কোয়ালিফিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক' (NTVQF) কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আধুনিক ল্যাব ও মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসারে গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে এবং কারিগরি শিক্ষার পর উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের পথ মসৃণ করতে হবে।
৫. কর্মসংস্থান তথ্য ব্যবস্থা (Labor Market Information System - LMIS): শ্রমবাজারে ঠিক কোন ধরনের দক্ষতার চাহিদা রয়েছে এবং ভবিষ্যতে কোন খাতের প্রসার ঘটবে, সে সম্পর্কে একটি শক্তিশালী ও বিজ্ঞানভিত্তিক ডেটাবেজ তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) এবং জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (NSDA) সমন্বয়ে এই তথ্যভাণ্ডার নিয়মিত আপডেট করতে হবে, যাতে তরুণরা সঠিক ক্যারিয়ার গাইডেন্স পায়।
৬. নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ সৃষ্টি: নারী নিট (NEET) গোষ্ঠীর বিশাল হার (৬২ শতাংশ) কমিয়ে আনতে হলে কর্মক্ষেত্রে ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন, নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা এবং নমনীয় কর্মঘণ্টা (Flexible working hours) নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তিভিত্তিক ঘরে বসে কাজের (Freelancing) সুযোগ নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
উপসংহার
বাংলাদেশের সামনে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশের যে সুবর্ণ সুযোগ উপস্থিত হয়েছে, তা অনন্তকাল স্থায়ী হবে না। ২০৪০ সালের পর থেকে দেশে কর্মক্ষম মানুষের চেয়ে বয়স্ক বা নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা বাড়তে শুরু করবে। এই সীমিত সময়ের মধ্যে লক্ষ লক্ষ তরুণকে যদি উৎপাদনশীল জনশক্তিতে রূপান্তর করা না যায়, তবে এই সম্ভাবনাটি একটি ভয়াবহ 'জনমিতিক বোঝায়' পরিণত হবে।
শিক্ষিত বেকারত্ব, দক্ষতা সংকট এবং কারিগরি শিক্ষার প্রতি অনীহা—এই তিনটি চ্যালেঞ্জ একটি আরেকটির সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। শুধু সার্টিফিকেট-নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা দিয়ে একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বিসিএস বা সরকারি চাকরির মোহে লাখো তরুণের যৌবনের সবচেয়ে উদ্ভাবনী সময়গুলো নষ্ট হচ্ছে, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। অন্যদিকে, কাঠামোগত বিনিয়োগের অভাবে দেশে উপযুক্ত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না, ফলে উচ্চশিক্ষিত তরুণরা চরম হতাশার মধ্যে দিন পার করছেন।
এই সংকট উত্তরণে রাষ্ট্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্প মালিক এবং সমাজ—সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে যেমন শিল্পের চাহিদানুযায়ী দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে হবে, তেমনি রাষ্ট্রকেও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করে নতুন কর্মসংস্থানের দুয়ার খুলতে হবে। কারিগরি শিক্ষাকে সামাজিক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করে, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের উপযোগী আইটি দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে তরুণদের বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমেই কেবল বাংলাদেশ তার কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক মুক্তি এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জন করতে সক্ষম হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দক্ষতা উন্নয়নের এই যুদ্ধে জয়ী হতে না পারলে, তরুণদের পুঞ্জীভূত হতাশা ভয়াবহ সামাজিক অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই সময় এখনই, শিক্ষাকে কর্মের সাথে এবং কর্মকে বাস্তব দক্ষতার সাথে সংযুক্ত করার।






