শিল্পকলার নানা দিক (অষ্টম শ্রেণি বাংলা ১ম পত্র) | সারাংশ, থিম ও সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর

শিল্প কলার নানা দিক: অষ্টম শ্রেণির বাংলার ১ম পত্র

‘আনন্দ ধারা বহিছে ভূবণে’- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের এই কথাগুলিতে শিল্প কলার মূল সত্যটি প্রকাশ পেয়েছে। সব মানুষই জীবনের এই আনন্দকে পাবার জন্যে কত রকম চেষ্টা করে যাচ্ছে। আনন্দ প্রকাশ জীবনীশক্তির প্রবলতারই প্রকাশ। আনন্দকে আমরা বুঝি রূপ-রস-শব্দ-স্পর্শ-গন্ধ ইত্যাদির সাহায্যে, ইন্দ্রিয়সকলের সাহায্যে। মানুষ যখন আনন্দ পায় তখন সে তার মনকে প্রকাশ করতে চায়-নানা রূপে। তাই সৃষ্টি হলো চিত্রশিল্পী, নৃত্য শিল্পী, সংগীত শিল্পী, কবি, সাহিত্যিক। পুরাকালের গুহা মানুষ থেকে শুরু করে বর্তমান যুগ পর্যন্ত মানুষ নিজের পাওয়া আনন্দকে সুন্দরকে অন্য মানুষের মধ্যে বিস্তার করতে চেয়েছে। তাই সৃষ্টি হয়েছে নানান আঙ্গিকের শিল্প কলা। যেমন-চিত্রকলা, ভাস্কর্য, নৃত্যকলা, সংগীত কলা, অভিনয় কলা, চলচ্চিত্র, স্থাপত্য ইত্যাদি বিভিন্নমুখী কলাভঙ্গি। প্রতিটি ক্ষেত্রেই মানুষ তার নিত্য নতুন অবদান রেখে চলেছে। শিল্পকলার বিস্তীর্ণ অঙ্গনে। শিল্পকলার একটি অস্পষ্ট অর্থ আমরা বুঝতে পারি কিন্তু শিল্পকলার সঠিক অর্থ কী আর শিল্পকলার গুণাগুণ কী, এই প্রশ্ন যদি কেউ করে তাহলে, উত্তর দেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। যেমন গান শুনে ভালো লাগে, ছবি দেখে ভালো লাগে, কিন্তু ভালো লাগে কেন, এই প্রশ্ন নিয়ে মানুষের মন চিন্তা ভাবনা করতে লাগলো- দেখা গেল, সকল শিল্পকলায় রূপ আছে, ছন্দ আছে, সুর আছে, রং আছে, বিশেষ গড়ন আছে, সবকিছুকে সাজাবার একটি সুবিন্যস্ত নিয়ম আছে। এই নিয়মটি লুকিয়ে থাকে, নিজেকে প্রকাশ করে না, সুন্দরের মধ্যে মিলেমিশে একটা বন্ধন সৃষ্টি করে। নিয়মটি না জানলেও সুন্দরকে চেনা যায়। একটি উপমা দেয়া যাক। পৃথিবীর সব ফুলই একই নিয়ম মেনে ফুল নাম পেয়েছে। আমরা দেখে বলি সুন্দর। এর নিয়মটি হলো, একই বিন্দু থেকে সকল পাপড়ি বিন্দুর চারিদিকে ছড়িয়ে থাকবে। কিন্তু এক নিয়ম মেনেই কত রকম ফুল। নিয়ম মেনেও ফুল স্বাধীন ভাবে ফুটে ওঠে। তোমাদের এখন সুন্দরের নিয়ম জানতে হবে না, সুন্দর লাগলেই সুন্দর বলবে। সুন্দর দেখতে দেখতেই একদিন সুন্দরের বিশেষ বিশেষ নিয়মগুলি জানতে পারবে। শুধু এইটুকু জেনে রাখো, সুন্দরকে জানার যে জ্ঞান তার নাম ‘নন্দনতত্ত্ব’। নন্দনতত্ত্ব মানে সুন্দরকে বিশ্লেষণ করা সুন্দরকে আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করা। সব সুন্দরের সৃষ্টির মধ্যেই একটা রূপ আছে, তার নাম

শিল্পকলার নানা দিক

শিল্পকলার নানা দিক

স্বাধীনত-অপর নাম যা খুশি তাই করা। যে কাজ সকলকে আনন্দ দেয় খুশি করে, তাই সুন্দর। স্বার্থপর বা অসংগত আমির খুশি নয়, অনেক মনে খুশির বিস্তার করা আমি। অন্ধকার ঘর আলোকিত করবার জন্যে নিয়ম মানা প্রদীপ জ্বালাতে হয়, ঘরে অসংগত আগুন লাগিয়ে ঘর আলোকিত করা নয়।

আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে, কত রকম জিনিস প্রয়োজন হয়- ঘটি, বাটি থেকে বিছানা পাত্র। শুধু প্রয়োজন মিটলেই মানুষ খুশি হয় না- মানুষের মন বলে প্রয়োজন মিটলেই হবে না তাকে সুন্দর হতে হবে। যেমন নকশি কাঁথা, রাত্রে বিছানায় গায়ে দিয়ে শোবার জন্য একটি সামগ্রী-সেটা তো সুন্দর অসুন্দর হওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু এই প্রয়োজনের জিনিসকে সুই আর রঙিন সুতা দিয়ে অপূর্ব নকশা করে সাজিয়েছে গাঁয়ের বঁধুরা। নকশিকাঁথা দেখলেই সুন্দর লাগে, জিনিসটির প্রয়োজনের কথা মনেই পড়ে না। এই কারণেই সকল জ্ঞানী মানুষ বলেন, সব সুন্দরই সরাসরি প্রয়োজনের বাইরে। অর্থাৎ প্রয়োজনের কাজ মিটল তো শরীরকে তৃপ্ত করল, আর প্রয়োজনের বাইরে যে সুন্দর তা মনকে তৃপ্ত করল। অর্থাৎ প্রয়োজন আর অপ্রয়োজন মিলিয়েই মানুষের সৌন্দর্যের আশা পূর্ণ হয়।

এবার বিভিন্ন শিল্পকলা নিয়ে সংক্ষিপ্ত করে কিছু বলা যাক। ছবি আঁকা। বিশ্বের সকল দেশেই শিশুরা ছবি আঁকে। বাংলাদেশের ছোটরাও খুব সুন্দর ছবি আঁকতে পারে।  ছবি আঁকা মানে ‘দেখা শেখা’। ছোটরা প্রকৃতিকে দেখে, মা-বাবা ভাই-বোন মিলিয়ে একটা সমাজকে দেখে। প্রতিদিনের দেখা, বিষয়বস্ত্ত, রং, গড়ন, আকৃতি দেখে শিশুমনের কল্পনার সঙ্গে মিলে মিশে যায়। নানা রকম গল্প শুনে দেশের কথা শুনে, কবিতা ছাড়া শুনেও শিশু মনে ছবি তৈরি হতে থাকে। এই সকল দেখা অদেখা বস্ত্ত নিয়ে শিশুরা ছবি আঁকে কল্পনা-বাস্তব মিলিয়ে। নিজেদের মনের কথা প্রকাশ করতে শেখে।

সকল শিল্পকলার মধ্যে কতগুলি মূল বস্ত্ত থাকে যেমন- বিন্দু, রেখা, রং, আকার, গতি বা ছন্দ, আলোছায়া গাঢ়-হালকার সম্পর্ক ইত্যাদি। এই সকলের মিলনেই হয় ছবি বা ভাস্কর্য। আর আছে মাধ্যম, অর্থাৎ কোন মাধ্যমে শিল্প সৃষ্টি হয়েছে। চিত্রকলার মাধ্যম হলো কালি-কলম, জল রং, প্যাস্টেল রং, তেল মিশ্রিত রং ইত্যাদি। ছোটদের জন্য প্যাস্টেল ও জল রং ব্যবহার করা সহজ হয়। বাংলাদেশে পুরাকালে জল রং দিয়েই ছবি আঁকত শিল্পীরা। পুরাতন পুঁথিতে তালপাতায় আঁকা ছবির বহু নিদর্শন আছে। বর্তমানেও জল রং অত্যন্ত প্রিয়, তবে এখন আর কেউ তালপাতায় আঁকে না, কাগজে আঁকে।

ভাস্কর্য। নরম মাটি দিয়ে কোনো কিছুর রূপ দেয়া বা শক্ত পাথর কেটে কোনো গড়ন বানানো। বিশেষ এক ধরনের ছাঁচ বানিয়ে গলিত মেটাল ঢেলে গড়ন বানানো, এই ধরনের কাজকে বলে ভাস্কর্য। আমাদের দেশে পোড়া মাটির ভাস্কর্য খুব প্রসিদ্ধ ছিল।

আমাদের সংস্কৃতি বা কালচার গড়ে উঠেছে নানান শিল্পকলার কারুকাজ দিয়ে। সকল শিল্পীর একটি দায়িত্ব আছে- দেশের ঐতিহ্যকে শ্রদ্ধা করা। বাংলায় একটি কথা আছে-‘কালি কলম মন, লেখে তিন জন’- কালি নামে দেশের ঐতিহ্যে হাজার বছর প্রবাহিত কালি, কলম হলো শিল্প সৃষ্টির বর্তমান সরঞ্জাম, আর মন হলো বর্তমান যুগের সঙ্গে ঐতিহ্যের মিল করে নিজেকে প্রকাশ করার মন। একটি দেশকে জানা যায় দেশের মানুষকে জানা যায় তার শিল্পকলা চর্চার ধারা দেখে। শিল্পকলা চর্চা সকলের পক্ষে অপরিহার্য।

সংক্ষিপ্তসার

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “আনন্দ ধারা বহিছে ভূবণে” পঙ্‌ক্তির মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে মানুষের জীবনের প্রধান আকাঙ্ক্ষা আনন্দ লাভ করা। মানুষ যখন আনন্দ অনুভব করে, তখন সে তা অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চায়। এই চাহিদা থেকেই চিত্রকলা, সংগীত, নৃত্য, সাহিত্য, ভাস্কর্য, অভিনয় ও স্থাপত্যসহ নানা শিল্পকলার সৃষ্টি হয়েছে।

শিল্পকলার মধ্যে রূপ, রং, ছন্দ, সুর ও একটি সুসংগঠিত নিয়ম বিদ্যমান থাকে। আমরা সেই নিয়ম না জানলেও সৌন্দর্য অনুভব করতে পারি। সৌন্দর্যকে বিশ্লেষণ ও গভীরভাবে উপলব্ধি করার জ্ঞানকে নন্দনতত্ত্ব বলা হয়। প্রকৃত সৌন্দর্য এমন কিছু যা কেবল ব্যক্তিগত সুখ নয়, বরং বহু মানুষের আনন্দের কারণ হয়।

মানুষের জীবনে শুধু প্রয়োজনীয়তা পূরণই যথেষ্ট নয়; সে সৌন্দর্যও চায়। যেমন নকশিকাঁথা একটি প্রয়োজনীয় সামগ্রী হলেও তার নকশা তাকে শিল্পের মর্যাদা দিয়েছে। তাই সৌন্দর্য মানুষের মনকে তৃপ্ত করে, আর প্রয়োজনীয়তা শরীরকে তৃপ্ত করে।

চিত্রকলাকে বলা হয়েছে “দেখা শেখা”। শিশুরা প্রকৃতি, সমাজ, মানুষ ও কল্পনার জগত থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ছবি আঁকে এবং নিজেদের ভাব প্রকাশ করতে শেখে। শিল্পকলার মৌলিক উপাদান হলো বিন্দু, রেখা, রং, আকার, ছন্দ ও আলো-ছায়া। অন্যদিকে, মাটি, পাথর বা ধাতুর মাধ্যমে গড়ে ওঠা শিল্পকর্মকে ভাস্কর্য বলা হয়।

সবশেষে বলা হয়েছে, একটি দেশের সংস্কৃতি শিল্পকলার মাধ্যমেই সমৃদ্ধ হয়। তাই দেশের ঐতিহ্যকে সম্মান করা এবং শিল্পচর্চা করা সকল মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয়।

মূলভাব

শিল্পকলা মানুষের আনন্দ, সৌন্দর্যবোধ, কল্পনা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সৃজনশীল প্রকাশ; তাই শিল্পচর্চা ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্য অপরিহার্য।

বুলেট পয়েন্টে মূল বিষয়গুলো

  • শিল্পকলার মূল উৎস হলো মানুষের আনন্দবোধ ও সৌন্দর্যচেতনা
  • মানুষ নিজের আনন্দ ও অনুভূতি অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চায় বলেই শিল্পকলার সৃষ্টি হয়েছে।
  • চিত্রকলা, ভাস্কর্য, নৃত্য, সংগীত, অভিনয়, চলচ্চিত্র ও স্থাপত্য শিল্পকলার প্রধান শাখা।
  • সকল শিল্পকলায় রূপ, রং, ছন্দ, সুর ও গঠনগত নিয়ম বিদ্যমান থাকে।
  • সৌন্দর্যের নিয়ম না জানলেও মানুষ সুন্দরকে অনুভব করতে পারে।
  • নন্দনতত্ত্ব হলো সৌন্দর্যকে বিশ্লেষণ ও গভীরভাবে উপলব্ধি করার জ্ঞান।
  • প্রকৃত সৌন্দর্য মানুষের মধ্যে আনন্দ ও কল্যাণের বিস্তার ঘটায়।
  • প্রয়োজনের পাশাপাশি মানুষ সৌন্দর্যও কামনা করে।
  • নকশিকাঁথা প্রমাণ করে যে প্রয়োজনীয় জিনিসও শিল্পের ছোঁয়ায় সুন্দর হয়ে উঠতে পারে।
  • প্রয়োজন শরীরকে তৃপ্ত করে, আর সৌন্দর্য মানুষের মনকে তৃপ্ত করে।
  • ছবি আঁকা মানে দেখা ও অনুভব করা শেখা
  • শিশুরা প্রকৃতি, সমাজ, কল্পনা ও অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ছবি আঁকে।
  • চিত্রকলার মৌলিক উপাদান হলো:
    • বিন্দু
    • রেখা
    • রং
    • আকার
    • গতি বা ছন্দ
    • আলো-ছায়া
    • গাঢ়-হালকার সম্পর্ক
  • চিত্রকলার মাধ্যম হিসেবে কালি, কলম, জলরং, প্যাস্টেল ও তেলরং ব্যবহৃত হয়।
  • বাংলাদেশে প্রাচীনকালে তালপাতা ও পুঁথিতে জলরং দিয়ে ছবি আঁকার প্রচলন ছিল।
  • মাটি, পাথর বা ধাতু দিয়ে গড়া শিল্পকর্মকে ভাস্কর্য বলা হয়।
  • পোড়ামাটির ভাস্কর্যের জন্য বাংলাদেশ একসময় বিশেষভাবে খ্যাত ছিল।
  • একটি দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য শিল্পকলার মাধ্যমে প্রকাশ পায়।
  • শিল্পীর দায়িত্ব হলো দেশের ঐতিহ্যকে সম্মান ও সংরক্ষণ করা।
  • শিল্পচর্চার মাধ্যমে একটি দেশ ও জাতির পরিচয় জানা যায়।
  • শিল্পকলা চর্চা ব্যক্তি, সমাজ ও সংস্কৃতির বিকাশের জন্য অপরিহার্য।

পাঠ্যাংশে উল্লেখিত শিল্পকলার বিভিন্ন দিক হলো:

  1. চিত্রকলা (Painting)
  2. ভাস্কর্য (Sculpture)
  3. নৃত্যকলা (Dance)
  4. সংগীতকলা (Music)
  5. অভিনয়কলা (Acting/Drama)
  6. চলচ্চিত্রকলা (Film/Cinema)
  7. স্থাপত্যকলা (Architecture)

পাঠ্যাংশে আলোচনা করতে গিয়ে সাহিত্যিককবির কথাও বলা হয়েছে। তাই শিল্পকলার বিস্তৃত পরিসরে আরও অন্তর্ভুক্ত করা যায়:

  1. সাহিত্যকলা (Literature)
  2. কবিতা বা কাব্যকলা (Poetry)

পরীক্ষার জন্য সংক্ষিপ্ত উত্তর

শিল্পকলার দিকগুলো হলো: চিত্রকলা, ভাস্কর্য, নৃত্যকলা, সংগীতকলা, অভিনয়কলা, চলচ্চিত্রকলা, স্থাপত্যকলা, সাহিত্যকলা ও কাব্যকলা। এগুলোর মাধ্যমে মানুষ তার আনন্দ, অনুভূতি, কল্পনা ও সৌন্দর্যবোধ প্রকাশ করে।

সারাংশ

মানুষের আনন্দবোধ ও সৌন্দর্যচেতনার প্রকাশ থেকেই শিল্পকলার জন্ম। মানুষ নিজের অনুভূতি ও আনন্দ অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চায় বলেই চিত্রকলা, সংগীত, নৃত্য, ভাস্কর্য, সাহিত্যসহ বিভিন্ন শিল্পকলার বিকাশ ঘটেছে। সকল শিল্পকলার মধ্যেই রূপ, রং, ছন্দ, সুর ও একটি সুশৃঙ্খল গঠন বিদ্যমান থাকে, যা সৌন্দর্য সৃষ্টি করে। সৌন্দর্যকে গভীরভাবে উপলব্ধি ও বিশ্লেষণ করার জ্ঞানকে নন্দনতত্ত্ব বলা হয়। মানুষের জীবনে প্রয়োজনীয়তার পাশাপাশি সৌন্দর্যও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রয়োজন শরীরকে তৃপ্ত করে আর সৌন্দর্য মনকে তৃপ্ত করে। শিল্পকলা মানুষের কল্পনা, সৃজনশীলতা ও সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে এবং দেশের ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই শিল্পচর্চা ব্যক্তি ও সমাজের জন্য অপরিহার্য।

সহজ ভাষায় থিম

  1. আনন্দ থেকেই শিল্পকলার সৃষ্টি হয়।
    1. মানুষ আনন্দ পেলে তা অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চায়, তাই শিল্পকলার জন্ম হয়েছে।
  2. শিল্পকলা সৌন্দর্যের প্রকাশ।
    1. ছবি, গান, নাচ, সাহিত্য ইত্যাদির মাধ্যমে মানুষ সুন্দরকে প্রকাশ করে।
  3. সৌন্দর্য উপলব্ধি করার জ্ঞানই নন্দনতত্ত্ব।
    1. সুন্দরকে বোঝা ও বিশ্লেষণ করার বিদ্যাকে নন্দনতত্ত্ব বলা হয়।
  4. মানুষ শুধু প্রয়োজন নয়, সৌন্দর্যও চায়।
    1. প্রয়োজনীয় জিনিস সুন্দর হলে তা মানুষের মনকে আরও আনন্দ দেয়।
  5. শিল্প মানুষের মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম।
    1. মানুষ শিল্পের মাধ্যমে নিজের অনুভূতি, চিন্তা ও কল্পনা প্রকাশ করে।
  6. শিশুদের সৃজনশীলতা বিকাশে চিত্রকলার গুরুত্ব রয়েছে।
    1. ছবি আঁকার মাধ্যমে শিশুরা পর্যবেক্ষণ ও কল্পনা করার ক্ষমতা অর্জন করে।
  7. শিল্পকলা দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের পরিচয় বহন করে।
    1. একটি দেশের শিল্পচর্চা দেখে সেই দেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা যায়।
  8. ঐতিহ্য রক্ষা করা শিল্পীদের দায়িত্ব।
    1. শিল্পীদের উচিত দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে সম্মান ও সংরক্ষণ করা।
  9. শিল্পচর্চা ব্যক্তি ও সমাজের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ।
    1. শিল্প মানুষের মননশীলতা, রুচিবোধ ও সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটায়।

এক লাইনের থিম

মানুষের আনন্দ, সৌন্দর্যবোধ ও সৃজনশীলতার প্রকাশই শিল্পকলা, যা ব্যক্তি, সমাজ ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে।

সৃজনশীল প্রশ্ন

১. মেহেরুন্নেসা এবার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হয়েছে। নবীনবরণ শেষে বান্ধবীদের সাথে ক্যাম্পাস ঘুরতে ঘুরতে এলেন কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে। সেখানে দেখেন- এক হাতে বন্দুক ধরে এক পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে বিশালাকার এক ভাস্কর্য। নাম- সংশপ্তক। নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও যে সম্মুখ পানে এগিয়ে যায় তাকেই বলে সংশপ্তক। ৭১-এর মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের কথা স্মরণ করে এইভাস্কযটি  বানানো হয়েছে। মনটা ভরে গেল মেহেরুন্নেসার।

ক. মুস্তাফা মনোয়ার কোথায় জন্মগ্রহণ করেন ?

খ. প্রয়োজন আর অপ্রয়োজন মিলেই মানুষের সৌন্দর্যের আশা পূর্ণ- কথাটি বুঝিয়ে লিখ।

গ. ক্যাম্পাসে মেহেরুন্নেসা শিল্পকলার কোন দিকটি দেখেছে? এর বর্ণনা দাও।

ঘ. মেহেরুন্নেসার দেখা দিকটিই শিল্পকলার প্রধান দিক- মন্তব্যটির যথার্থতা যাচাই কর।

২. নন্দলাল বসু তাঁর ‘শিল্পকলা’ গ্রন্থে বলেছেন- ‘যে সৃষ্টির মধ্যে মানুষের প্রয়োজন সাধন অপেক্ষা অহেতুক আনন্দ বেশি, যাহাতে মানুষের জৈব অপেক্ষা আত্মিক ও মানসিক আনন্দ সৃষ্টি বেশি, তাহাকে আমরা ললিতকলা বলিয়া আখ্যায়িত করিতে পারি। আবার যাহাকে আমরা ললিতকলা বলি তাহাও আরেক দিক হইতে কারুকলা শ্রেণিভুক্ত হইতে পারে। স্থাপত্যবিদ্যাপ্রসূত সুরম্য প্রাসাদকে যখন মানুষের বসবাস উপযোগী করিয়া দেখি তখন তাহা কারুশিল্প। আবার উহাকে যখন রূপময় অসীম সৌন্দর্য সৃষ্টি হিসেবে দেখি তখন তাহা চারুকলা।’

ক. পুরাকাল শব্দের অর্থ কী ?

খ. শিল্পকলা চর্চা সকলের পক্ষে অপরিহার্য কেন ?

গ. উদ্দীপকের ললিতকলা বলতে শিল্পকলার নানা দিক প্রবন্ধের যে বিষয়টিকে নির্দেশ করা হয়েছে তা ব্যাখ্যা কর।

ঘ. চারুকলা ও চারুকলার সমন্বিত রূপ শিল্পকলা- শিল্পকলার নানা দিক প্রবন্ধের আলোকে বিশ্লেষণ কর।

সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর:

১ নং সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর

ক. মুস্তাফা মনোয়ার কোথায় জন্মগ্রহণ করেন?

উত্তর: মুস্তাফা মনোয়ার যশোর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন।

খ. প্রয়োজন আর অপ্রয়োজন মিলেই মানুষের সৌন্দর্যের আশা পূর্ণ- কথাটি বুঝিয়ে লিখ।

উত্তর: মানুষের জীবনে কিছু জিনিস প্রয়োজন মেটায়, যেমন খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ইত্যাদি। কিন্তু মানুষ কেবল প্রয়োজন পূরণ করেই সন্তুষ্ট থাকে না; সে সৌন্দর্যও খোঁজে। যেমন নকশিকাঁথা শীত নিবারণের জন্য প্রয়োজনীয় হলেও তার সুন্দর নকশা মানুষের মনে আনন্দ দেয়। তাই প্রয়োজন শরীরকে তৃপ্ত করে আর সৌন্দর্য মনকে তৃপ্ত করে। এ দুয়ের সমন্বয়েই মানুষের সৌন্দর্যবোধ ও জীবনের পূর্ণতা আসে।

গ. ক্যাম্পাসে মেহেরুন্নেসা শিল্পকলার কোন দিকটি দেখেছে? এর বর্ণনা দাও।

উত্তর: মেহেরুন্নেসা শিল্পকলার ভাস্কর্য দিকটি দেখেছে।

ভাস্কর্য হলো মাটি, পাথর, কাঠ বা ধাতু দ্বারা কোনো ব্যক্তি, ঘটনা বা ভাবনার রূপ নির্মাণের শিল্প। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে অবস্থিত ‘সংশপ্তক’ ভাস্কর্যটি মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস ও আত্মত্যাগের প্রতীক। এক হাতে বন্দুক নিয়ে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা যোদ্ধার অবয়ব স্বাধীনতার চেতনা প্রকাশ করে। এ ধরনের শিল্পকর্ম মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম ও ইতিহাস সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করে।

ঘ. মেহেরুন্নেসার দেখা দিকটিই শিল্পকলার প্রধান দিক- মন্তব্যটির যথার্থতা যাচাই কর।

উত্তর: মন্তব্যটি সম্পূর্ণ যথার্থ নয়

মেহেরুন্নেসা ভাস্কর্য দেখেছে, যা শিল্পকলার একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা। তবে শিল্পকলা শুধু ভাস্কর্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। চিত্রকলা, সংগীত, নৃত্য, অভিনয়, সাহিত্য, চলচ্চিত্র ও স্থাপত্যও শিল্পকলার গুরুত্বপূর্ণ দিক। প্রতিটি শিল্পমাধ্যম মানুষের অনুভূতি, চিন্তা ও সৌন্দর্যবোধকে প্রকাশ করে। ভাস্কর্য যেমন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ধারণ করে, তেমনি সংগীত বা চিত্রকলাও মানুষের আবেগ ও সংস্কৃতিকে প্রকাশ করে। তাই ভাস্কর্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও একে শিল্পকলার একমাত্র বা প্রধান দিক বলা যায় না; বরং এটি শিল্পকলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শাখা।

২ নং সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর

ক. পুরাকাল শব্দের অর্থ কী?

উত্তর: পুরাকাল শব্দের অর্থ হলো প্রাচীনকাল বা অতীত যুগ

খ. শিল্পকলা চর্চা সকলের পক্ষে অপরিহার্য কেন?

উত্তর: শিল্পকলা মানুষের সৌন্দর্যবোধ, সৃজনশীলতা ও সাংস্কৃতিক চেতনাকে বিকশিত করে। এর মাধ্যমে মানুষ নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে শেখে এবং দেশের ঐতিহ্য সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে। শিল্পচর্চা মননশীলতা, রুচিবোধ ও মানবিক গুণাবলি বৃদ্ধি করে। তাই শিল্পকলা চর্চা সকলের জন্য অপরিহার্য।

গ. উদ্দীপকের ললিতকলা বলতে ‘শিল্পকলার নানা দিক’ প্রবন্ধের যে বিষয়টিকে নির্দেশ করা হয়েছে তা ব্যাখ্যা কর।

উত্তর: উদ্দীপকের ‘ললিতকলা’ বলতে ‘শিল্পকলার নানা দিক’ প্রবন্ধে বর্ণিত সৌন্দর্য ও আনন্দ সৃষ্টিকারী শিল্পকলাকে বোঝানো হয়েছে।

প্রবন্ধে বলা হয়েছে, শিল্পকলার উদ্দেশ্য কেবল প্রয়োজন পূরণ নয়; মানুষের মনে আনন্দ ও সৌন্দর্যের অনুভূতি সৃষ্টি করাও এর লক্ষ্য। ছবি, সংগীত, নৃত্য, ভাস্কর্য ইত্যাদি শিল্প মানুষের আত্মিক ও মানসিক তৃপ্তি দেয়। নন্দলাল বসুও বলেছেন, যে শিল্প মানুষের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি আনন্দ সৃষ্টি করে, তা ললিতকলা। সুতরাং সৌন্দর্য ও মানসিক আনন্দদায়ী শিল্পই এখানে ললিতকলার নির্দেশক।

ঘ. চারুকলা ও কারুকলার সমন্বিত রূপ শিল্পকলা- ‘শিল্পকলার নানা দিক’ প্রবন্ধের আলোকে বিশ্লেষণ কর।

উত্তর: উক্তিটি যথার্থ।

‘শিল্পকলার নানা দিক’ প্রবন্ধে দেখানো হয়েছে যে মানুষের জীবনে প্রয়োজন ও সৌন্দর্য উভয়েরই গুরুত্ব রয়েছে। কারুকলা মূলত প্রয়োজনীয় বস্তুকে সুন্দর করে তোলে, যেমন নকশিকাঁথা। অন্যদিকে চারুকলার প্রধান লক্ষ্য হলো সৌন্দর্য সৃষ্টি ও মানসিক আনন্দ প্রদান।

উদ্দীপকের প্রাসাদের উদাহরণে দেখা যায়, বসবাসের উপযোগিতার দিক থেকে এটি কারুকলা, আর নান্দনিক সৌন্দর্যের দিক থেকে এটি চারুকলা। অর্থাৎ একই শিল্পকর্মে প্রয়োজন ও সৌন্দর্য উভয়ই থাকতে পারে। প্রবন্ধেও বলা হয়েছে যে মানুষের জীবনে প্রয়োজন ও অপ্রয়োজনের সমন্বয়েই সৌন্দর্যের পূর্ণতা আসে।

অতএব, চারুকলার সৌন্দর্যচেতনা এবং কারুকলার ব্যবহারিক প্রয়োজনের সমন্বয়েই শিল্পকলার পূর্ণাঙ্গ রূপ গড়ে ওঠে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top